মাছশূন্য কুয়াকাটা সমুদ্র উপকূল

নিনা আফরিন, সানজিদা, পটুয়াখালীঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পর্যটন কেন্দ্রের পলিথিন-চিপসসহ বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে ফেলা এবং সাগরে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে কুয়াকাটা সমুদ্র উপকূল। ফলে দাদোনের যাতাকলে পড়ে সর্বোস্ব হারিয়ে এলাকা ছেড়েছেন অনেক সমুদ্রগামী জেলে। আবার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেকে পেশা ছেড়ে এখন নতুন নতুন পেশায় ঝুঁকছে

উপকূলীয় এলাকায় মাছ না থাকায় সরকারের ইলিশ উৎপাদনের তথ্যে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় জেলেদের। জরুরি ভিত্তিতে জাটকা সংরক্ষণ, কুসুম জাল ও ছোট ফাসের জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ,পর্যটন কেন্দ্রের বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা বন্ধ না করা হলে নিকট ভবিষ্যতে কুয়াকাটা সংলগ্ন সমুদ্র উপকূল মৎস্য শূন্য হবার সম্ভবনা রয়েছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

মাছের বদলে পলিথিন:
দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে সমুদ্রের সাথে সম্পর্ক জাহাঙ্গীর মল্লিকের (৪৩)। বাপ দাদার হাত ধরে সাগরে যাওয়া সেই ছোট বেলায়। সোনালী ইলিশকে ভালোবেসে এই পেশায় আসলেও এখন বেড়িয়ে এসেছেন এই পেশা থেকে। তিনি জানান, তার ছোট বেলায় বাবার সাথে যখন সমুদ্রে যেতেন তখন শুধুমাত্র ইলিশ শিকার করতেন তারা।

বড় বড় সাইজের মাছ পেতেন কুয়াকাটা সংলগ্ন সমুদ্রের উপকূলীয় এলাকায়। সে সময় একমাত্র ইলিশ মাছ ছাড়া অন্য কোন মাছ তারা শিকার করতেন না। তাদের ইলিশের জালে লইট্টা,তুলার ডাডিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উঠতো। সে সব মাছ নৌকায় না তুলে ফেলে দিতেন সমুদ্রের নোনা জলে।

স্মৃতি হাতরে জাহাঙ্গীর মল্লিক জানান, তারা মুলত খুটা জাল ফেলতেন। প্রত্যেক গোনে গিয়ে মাছ নিয়ে আবার তীরে ফিরে আসতেন। কোন কোন সময় এমনও হয়েছে এক গোনে যে মাছ পেয়েছেন তার অর্ধেক তুলে বাবি মাছ আর তুলতে পারেন নি। জাল কেটে দিয়ে আসা লেগেছে।

এখন সব কিছু স্বপ্নের মতো মনে হয়। সাগরের এত মাছ হারিয়ে গেলো কোথায় এমন প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর জানান, পুরো উপকুল জুড়ে এখন চর আর চর। আগে যেখানে ১০ বাম (এক বাম সমান পাঁচ হাত) পানি ছিলো এখন সেখানে হাঁটু পানি। জাল ফেলার আর কোন জায়গা নাই। চরের মাঝে মাঝে যে সরু চ্যানেলগুলো আছে সেসব চ্যানেলে জাল পাতলে মাছ পাওয়া যায় না।

মাছের বদলে জালে উঠে শুধু পলিথিন আর পলিথিন। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার সকল ধরনের পলিথিন, চিপস আর বিভিন্ন পণ্যের পলিথিন নির্বিচারে ফেলা হয় সাগরে। ভাসতে ভাসতে তার গভীর সমুদ্রে গিয়ে ধরা পরে জেলেদের জালে।

আলাপকালে জাহাঙ্গীর জানান, পেশায় টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনভাবেই পেশায় টিকতে পারছেন না। তিনি অভিযোগ করে বলেন,আগে ইলিশের মৌসুম ছিলো বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে এই সময়ের মধ্যে দুই দফা অবরোধ দেয় সরকার। প্রথম ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন থেকে এক মাস আবার পরে ৬৫ দিন।

তিনি জানান, ২২ দিনের অবরোধ স্থানীয় জেলেরা সবাই মানে। কেউ সমুদ্রে মাছ শিকারে যায় না। কিন্তু একই সময় ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় প্রবেশ করে হাজার হাজার টন মাছ শিকার করে নিয়ে যায়। অবরোধে দেশের জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটায় কিন্তু ভারতের জেলেরা মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ায় ইলিশের উৎপাদন বাড়ে না। আর পরবর্তীতে ৬৫ দিনের যে অবরোধ সরকার দিয়ে থাকে সেটা জেলেদের মেরে ফেলার সামিল।

কারণ হিসেবে তিনি জানান,৬৫ দিনের অবরোধে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করতে সরকারি নিষেধ রয়েছে। কিন্তু যারা খুটা জালে উপকুলের দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে মাছ শিকার করে তাদের কি কারণে মাছ শিকার বন্ধ করা হয় তা তিনি বুঝতে পারেন না বলে দাবি করেন তিনি। মৌসুমের বিশাল একটা সময় মাছ ধরতে না পারা এবং আগের মতো মাছ না পাওয়ায় গত চার বছরে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা ঋণ হয়েছে তার। তাই বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তন করতে।

একই এলাকার আরেক জেলে জামাল আকন (৫২)। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পেশার সাথে ছিলেন। কিন্তু শেষে এক লক্ষ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দুবাই চলে যান ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়।

দাদার হাত ধরে পেশায় এসেছিলেন মোঃ সোহেল (২৯)। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন পেশা ছাড়তে মারিয়া। তিনি বলেন, সমুদ্রে যে মাছ পাই তার শতকরা ১০ ভাগ আড়ৎদার কমিশন হিসেবে নিয়ে নেয়। তাদের টাকা না দিয়ে কোন উপায় নাই।

গভীর সমুদ্রে ঝড় ঝঞ্জায় নৌকা ও জাল প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো মেরামতের জন্য সময় অসময়ে নগদ টাকার দারকার হয়। কোন কোন সময় মাছ পড়ায় দিনের দিনের পর শূন্য হাতে সাগর থেকে ফিরতে হয়। তখন বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়। মৌসুমে যদি মাছ মোটামুটি পড়ে তা দিয়ে যা ইনকাম হয় তা দিয়ে কোনো মতে দিন চলে। বছরের পর বছর যায় কিন্তু দাদনের ঋণ আর শোধ করতে পারেন না সোহেল। সোহেলের দাবি, এখন সমুদ্রে মাছ না পড়ার কারণে তাদের মতো হাজার হাজার জেলে পেশা পরিবর্তন করে অন্য কাজের দিকে ঝুঁকছে।

কেন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না:
কুয়াকাটা সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় মাছ কমে যাওয়ার একাধিক কারণ বর্ণনা করেছেন স্থানীয় জেলেরা। জাহাঙ্গীর (৪৩), জামাল আকন (৫২), সোহেল (২৯) সহ একাধিক জেলে জানান, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে সৃষ্টি হয়েছে চর বিজয় নামক বিশাল এক চরের। স্থানীয়দের কাছে যা হাইরার চর নামে পরিচিত। হাজার হাজার একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ চর শীতকালে পাখির অভয়ারণ্যে পরিনত হয়। চলতি বছর স্থানীয় সংসদ সদস্য মহিব্বুর রহমানকে নিয়ে এ চরে বৃক্ষ রোপণ শুরু করেছে স্থানীয় বন বিভাগ। পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত এ চরের কারণে রামনাবাদ মোহনাসহ প্রায় ১০টি নদীর মোহনায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত

হচ্ছে। নদীর মূল চ্যানেল ভরে গিয়ে ছোট ছোট বিকল্প চ্যানেল দিয়ে পানি উঠানামা করছে। জোয়ারের সময় এগুলো দেখা না গেলেও ভাটার সময়
চরগুলো জেগে ওঠে।

জেলেরা জানান, উপকূল জুড়ে অসংখ্য ছোটবড় চর জেগে ওঠায় মাছের চলাচলের গতিপথ নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে আগে যে সকল জায়গায় জাল পাতলে মাছ পাওয়া যেত এখন সেসব স্থানে কোন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা আরও জানান, পায়রা বন্দরের জাহাজ আসা যাওয়ার জন্য রামবনাবাদ চ্যানেলের মোহনা থেকে এক নম্বর বয়া পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার চ্যানেল ড্রেজিং করে নাব্যতা সংকট কাটানোর কাজ চলছে। সাগরের মাঝে প্রতিনিয়ত ড্রেজিং চলমান থাকায় এবং সাগর থেকে বালি তুলে আবার সাগরে ফেলায় মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

তারা আরও বলেন, পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের গরম পানি নদীতে ফেলায় রাবনাবাদ চ্যানেল অচিরেই মাছ শূন্য হবে।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজেদুল হক জানান, জেলেরা যে দাবিগুলো করেছে এ বিষয়ে কোন সুনিদিষ্ট তথ্য বা গবেষণা নেই। বিগত কয়েক মাস আগে পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের একজন চায়নিজ প্রকৌশলী তাদের ক্যাম্পাসে গিয়ে রাবনাবাদ চ্যানেলে পানি কতগুলো নমুনা পরীক্ষা করিয়েছেন। বড় ধরনের কোন ঝড় জলোচ্ছাস হলে পায়রা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র লবন পানির কোন ঝুকিতে পড়বে কিনা সেটা ছিলো পানি পরীক্ষার মূল কারণ।

তিনি জানান, উপকূলের জেলেরা সাগরে মাছ না পেলেও ট্রলিং এ যারা মাছ শিকার করছেন তারা কিন্তু মাছ পাচ্ছেন। এখন জেলেরা যে দাবিগুলো করছে এ বিষয়ে দ্রুত একটি গবেষণা করা প্রয়োজন। আসলেই পায়রা তাপবিদ্যুতের কারণে কোন প্রভাব পড়ছে কিনা সেটা জানা দরকার। আর সমুদ্রে যে ছোট বড় চর জেগে উঠেছে তার ফলে কি পরিমান মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে তাও জানা প্রয়োজন।

তবে তিনি দাবি করেন, আগের তুলনায় জেলে এবং ট্রলারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রত্যেকের ভাগ থেকে মাছ কমে যাচ্ছে। কিন্তু সামষ্টিকভাবে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সনাতনী পদ্ধতিতে মাছ শিকার করায় মাছ কম পাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লাহ জানান, কুয়াকাটা সমুদ্র সংলগ্ন এলাকা থেকে গত কয়েক বছর ধরে ইলিশ মাইগ্রেট করে কক্সবাজার এবং ভোলা জেলা সংলগ্ন চর কুকরি মুকরি, পটুয়াখালীর সোনার চরের মোহনাগুলো দিয়ে পদ্মা মেঘনায় যাতায়ত করছে। এ কারণে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমান কম। তাছাড়া এই এলাকা থেকে মাছ অন্য এলাকা দিয়ে যাতায়াত করার ফলে পায়রা এবং রাবনাবাদ চ্যানেলে ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে যেহেতু ইলিশ এখান থেকে মাইগ্রেট করা শুরু করেছে ভবিষ্যতে অন্য সব মাছও এই নদীগুলো থেকে মাইগ্রেট করে অন্যত্র চলে যাবে। জেলেরা পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্রেকে দায়ী করছেন। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এলাকার পলিথিন এবং বর্জ্য সাগরে ফেলাকে দায়ী করছেন।

হঠাৎ করে মাছ কেন গতিপথ পরিবর্তন করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এটা নিয়ে বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন। তবে স্বাভাবিক দৃষ্টি এবং অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, সমুদ্র মোহনাগুলোতে চর পড়ে যাচ্ছে। চর বিজয়ের ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন দৃশ্যমান। এটি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রের বুকে চর জেগে ওঠার ফলে মাছের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, এক এলাকায় মাছ না পাওয়া গেলেও অন্য এলাকায় কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। বছর শেষে দেখা যায় ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মাছ না পাওয়ায় কি পরিমান মানুষ পেশা পরিবর্তন করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে একটি জরিপ কাজ চলামান রয়েছে। শতকরা কতভাগ লোক পেশা পরিবর্তন করছে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সুনিদিষ্টভাবে বলা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

 

প্রতিবেদনটি ডয়েচ ভেলে একাডেমি নারী সাংবাদিক মেন্টরশীপ কর্মসূচির আওতায় তৈরী।