সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋনের অভাব

গুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তাবয়ন হলে পাল্টে যাবে পটুয়াখালীর পর্যটন শিল্পের চিত্র

  • ⇒সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋনের অভাব
  • গুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তাবয়ন হলে পাল্টে যাবে পটুয়াখালীর পর্যটন শিল্পের চিত্র

নিনা আফরিন,পটুয়াখালীঃ করোনা মহামারীর ধকল কাটিয়ে ঘুড়ে দাড়াতে শুরু করেছে পর্যটন নগরী কুয়াকাটাসহ পটুয়াখালীর অন্যাণ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলো। ইতিমধ্যে ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের পদচারনায় মুখর হয়ে উঠেছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। তবে করেনাকালীন দীর্ঘ লক ডাউনে ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী,হোটেল মোটেল ও রেস্তোরার মালিকসহ বিশাল একটির অংশ বর্তমানে মুলধন সংকটে রয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে স্বল্পসুদে জামানত বিহীন ঋন সুবিধা প্রদান করা হলে পর্যটন শিল্প নির্ভর ব্যবসায়ীরা আবারো পূর্ণ উদ্যোমে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন বলে অভিমত তাদের।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে পূর্ণতা ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস এর সত্ত্বাধীকারী জানান, ঝড়-জলোচ্ছাস এবং প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করেই টিকে আছে পটুয়াখালীর পর্যটন কেন্দ্রগুলো। তবে প্রচারের অভাবে বেশীর ভাগ পর্যটন স্পটগুলোই সাধারন মানুষের নজরে আসে না। পটুয়াখালী জেলায় সমুদ্র সৈকত কেন্দ্রীক একাধীক পর্যটন স্পট রয়েছে। শুধুমাত্র উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে মানুষ কুয়াকাটা ভ্রমনে আসে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের থেকে আরো সুন্দর সুন্দর একাধীক সমুদ্র সৈকত রয়েছে পটুয়াখালীতে। শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারনে পর্যটকরা সেখানে পৌছাতে পারে না। এছাড়া ঐতিহাসেক বিভিন্ন নির্দশন রয়েছে পটুয়াখালীতে। যেগুলো সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পটুয়াখালীর যে পর্যটন কেন্দ্রগুলো তা হলো:-

∞মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ:

পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার মজিদবাড়িয়া গ্রামে পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত এক পুরাতন মসজিদ সুলতানী আমলের স্থাপত্যকীর্তি নিয়ে আজও সগৌরবে বিদ্যমান আছে। স্থানীয়ভাবে এটি মসজিদ-ই-মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ নামে পরিচিত। মির্জাগঞ্জ উপজেলা সদরের ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এই মসজিদটি অবস্থিত। স্বাধীন বাংলার ইলিয়াস শাহী শাসনামলের শেষ দিকে নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের পুত্র রুকুন উদ্দিন বারবক শাহের(১৪৫৯-১৪৭৬খ্রীঃ) শাসন আমলে খান-ই মোয়াজ্জম উজিয়াল খান ১৪৬৫ খ্রীষ্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদের গায়ে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। শিলালিপিটি বর্তমানে কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি যাদুঘরে রক্ষিত আছে। মসজিদটির নামানুসারেই স্থানীয় গ্রাম ও ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। মসজিদটির প্রধান কামরা বর্গাকারে নির্মিত এবং প্রত্যেকটি বাহু সাড়ে ২১ ফুট লম্বা। মসজিদের দেওয়ালগুলি প্রায় সাড়ে ৬ ফুট চওড়া। মসজিদের পূর্ব দিকে ৩টি এবং উত্তর দিকে ও দক্ষিণ দিকে ৪টি করে দরজা আছে। পশ্চিম দিকের দেওয়ালে ৩টি মেহরাব আছে। যার মাঝখানেরটি পার্শ্ববর্তী ২টার চেয়ে আকারে বড়। প্রধান কামরার উপরে আধা গোলাকৃতির একটি সুন্দর বিরাট গম্বুজ আছে। বরান্দার ছাদ চৌচালা ঘরের আকারে নির্মিত। মসজিদটির প্রধান কামরার ৪ কোণায় ৪টি এবং বারান্দার ২ কোণায় ২টি মিনার আছে। বৃটিশ আমলের শেষ দিকে সুন্দরবন এলাকার জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় এই মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়। মসজিদ সংলগ্ন চত্বরে প্রতিদিন শত শত মানুষ এটি দেখার জন্য আসেন। এছাড়া প্রতি বছর ওয়াজ মাহফিলে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান শরীক হন।

∞পাষাণময়ী কালী মন্দির:

বাংলা ১৩০৬ সালে জমিদার বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী তার লোকদের আদেশ দেন কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার। ইসিবপুর নিবাসী স্বরূপ চন্দ্র দে রাজমিস্ত্রী দ্বারা মন্দির নির্মাণ করে তার মধ্যে শ্মশান প্রস্তত করা হয়। নায়েব চন্দ্র কুমার সরকার কলিকাতা থেকে তৈরি করে ১৩০৭ সালের ১৮ আশ্বিন কলসকাঠীতে আনেন কালী মাতার বিগ্রহ। ৫ বছর ৮ মাস ১১ দিন পর ১৩১৩ সালের ২৯ জ্যৈষ্ঠ কলসকাঠী থেকে পটুয়াখালী শহরের প্রাণ কেন্দ্র জমিদার বিশ্বেশর রায় চৌধুরীর কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গনে(বর্তমান এ্যাকোয়ার স্টেটেট,সদর ভূমি অফিস সংলগ্ন) এই মন্দিরে আনা হয় কালী মাতার বিগ্রহ এবং তা ৮ বছর ১০ মাস বিনা প্রতিষ্ঠায় থাকে। অবশেষে ১৩২১ সালের ৩০ চৈত্র অমাবশ্যার তিথিতে মহাবিষুব সংক্রান্তি দিবসে অভ্যুদায়িক পৌরানিক মতে ঐ মন্দিরে কালী মাতার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় তন্ত্রমতে। মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে জমিদার বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী তার আত্মীয়-স্বজন বরিশাল থেকে লঞ্চ নিয়ে আসেন পটুয়াখালীতে। ঐ সময় তিনজন পুরোহিত রোহিনী কুমার চক্রবর্তী, মনোরঞ্জন চক্রবর্তী ও ভবরঞ্জন চক্রবর্তীকে নিযুক্ত করা হয় অমাবশ্যার পূজা ও দৈনিক পূজা করার জন্য। শতাব্দীকালের পুরানো এই মন্দিরটি আজো টিকে আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্তরা এখানে প্রতিনিয়ত আসেন কালী মায়ের অনুকম্পা পেতে।

ডাকাতিয়া কালীবাড়ি সেন্টার পাড়ার এই কালী বাড়ি ৫ শত বছরের পুরনো বলে অনেকে দাবী করেন। একদল কাপালিক ছাড়া অন্য কোন জনমানবের পদচারণা ছিল না এই ভূখন্ডে। গভীর অরণ্যে ঘেরা সুন্দরবনাঞ্চলের মাঝে উঁচু মাটির টিলার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এই মন্দির(বর্তমান সেন্টারপাড়া কালি মন্দির)। ঐ মন্দিরে চৈত্র অমাবশ্যায় কালী পূজায় দেবীর নামে উৎ্সর্গ করে দেয়া হতো নরবলি। পাশের নদী দিয়ে যাতায়াতকারী লোকজন ঢাক-বাদ্যের শব্দ শুনে শিউরে উঠে বলত ঐখানে ডাকাতিয়া কালীবাড়ি। ভয়ে সেখানে যেতো না কেউ। লুণ্ঠনই ছিল তাদের পেশা। চন্দ্রদ্বীপের জনবসতি এলাকায় ও নৌপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক নৌকায় ডাকাতি করে তারা লুটে নিত ধন-রত্ন ও প্রয়োজনীয় মালামাল। ফিরে আসার সময় তারা অপহরণ করে আনতেন নিখুঁত ও সুঠামদেহী কোন কিশোর কিংবা যুবককে। ফিরে এসে বিশাল আয়োজন করতেন চৈত্র অমাবশ্যায় কালী পূজার। এই পূজায় কালী মাতার নামে উৎসর্গ করে তাকে দেয়া হতো নরবলি। কালের পরিবর্তনে জমিদারী আমলে লোকজনের আগমন ঘটে। কাপালিকরা মন্দির পরিত্যাগ করে চলে যায় অন্যত্র। জমিদাররা সেখানে প্রতিষ্ঠা করে সার্বজনীন কালী মাতার মন্দির। বর্তমান সময়ে এই কালি মন্দির পরিদর্শনে আসেন অনেক হিন্দু ভক্ত।

∞কুয়াকাটা-সুন্দরবন-সোনারচর:

পটুয়াখালী জেলার পর্যাটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশী পর্যাটকরা প্রতিনিয়ত ভীড় করেন কুয়াকাটায়। পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষন এখানকার আদিবাসী রাখাইনদের স্থাপত্য শিল্প। এসব স্থাপত্য নিদর্শন পর্যাটকদের হৃদয় কেড়ে নেয় । সৈকতের কোল ঘেসেই উপজাতি রাখাইন সমপ্রদায়ের কেরানী পাড়া। এখানে আছে শত বছরের পুরানো সীমা বৌদ্ধ মন্দির। কুয়াকাটা বেড়িবাধেঁর পাশে খানিকটা উচুঁ টিলার উপর এর অবস্থান। মন্দিরের ভিতরে প্রায় সাড়ে তিন ফুঁট উচুঁ বেদির উপর স্থাপিত রয়েছে নবম ধাতুর তৈরি সাড়ে ৩৭ মন ওজনের পৌনে ৭ ফুঁট উচ্চতার ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ দেবের মূর্তি। বৌদ্ধ ধর্মের আড়াই হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষে ৮৩ বছর পূর্বে এ নবম ধাতুর মূর্তিটি স্থাপন করেন উপেংইয়া ভিক্ষু । মন্দিরের পাশেই চীনা স্থাপত্যের অনুকরনে নির্মান করা হয়েছে শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহার।
সেখানে বসে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ধর্ম সভা করেন । মন্দিরের একটু পাশেই রয়েছে কুয়াকাটার সেই ঐতিহ্যবাহী কুয়া বা ইন্দিরা। এ কুয়া থেকেই আজকের কুয়াকাটার পরিচিতি। কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মিস্ত্রিপাড়া। এ পাড়ায় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে । এ মূর্তিটির উচ্চতা ৩৫ ফুট । এ মন্দিরের সামনেই সিমেন্ট দিয়ে দু’টি বাঘ তৈরি করা আছে । দেখে মনে হয় যেন জীবন্ত দুটি বাঘ মন্দিরকে পাহাড়া দিচ্ছে। আরাকান রাজার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে ১৭৮৪ সালে ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি নৌকাযোগে দেশত্যাগ করে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী,কলাপাড়া,কুয়াকাটা ও তালতলীতে এসে সুন্দরবন পরিস্কার করে বসতি স্থাপন করেন। অতিসম্প্রতি কুয়াকাটা সংলগ্ন নারকেল বাগানে একটি নৌকার সন্ধান পান পর্যটকরা। পরে এটি বিশেষ ব্যবস্থায় উত্তোলন করে পর্যটকদের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে কুয়াকাটায়।

কুয়াকাটার পাশে রয়েছে বাড়তি পাওনা হিসেবে সুন্দরবনের পূর্বঞ্চালে। ফাতরারবনাঞ্চল,সোনাকাটা,ট্যাংরাগিড়ির বনাঞ্চল,ওয়াচ টাওয়ার এখন আকর্ষনীয় স্থান পর্যটকদের কাছে।
সোনারচরে সোনা নেই ঠিকই কিন্তু আছে সোনার মতো বালি। সূর্যের প্রখর রোদ যখন বালির উপর পরে দূর থেকে তা দেখতে সোনার মতই। তাই নাম সোনারচর। প্রায় ১০ হাজার একরের বিশাল বনভূমি। পটুয়াখালী বন বিভাগের তথ্য মতে, সুন্দরবনের পরেই আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল। “সোনারচর” অত্যন্ত আকর্ষনীয় পর্যটকদের কাছে। বনের মধ্যে আট কিলোমিটার লেক এবং বিশাল সৈকত সেন্টমার্টিনকে যেন হার মানায় সৌন্দর্যের দিকে দিয়ে। শুধু সোনারচর নয় পার্শ্ববর্তী রূপারচর, মৌডুবি, চরতুফানিয়া,চরকবির, চরফরিদ, শিপের চরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার মত। এর প্রত্যকটিই সাগরের বুক চিরে জেগে উঠেছে প্রকৃতির অনাবিল নিবিরতা নিয়ে। সৌন্দর্যের আধার দ্বীপগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করলে পর্যটন শিল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ হবে। সোনারচর দেশের যে কতটা সুন্দর দ্বীপ তা সাগর পাড়ের দ্বীপগুলো ঘুরে না আসলে বোঝানো যাবে না।

পটুয়াখালীতে আরো কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এগুলো হলো কলাপাড়ার পাখিমারা এলাকায় পানি জাদুঘর,পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস,শ্রীরামপুর জমিদার বাড়ি,কলাপড়ায় অবস্থিত রাডার ষ্টেশন ও আবহাওয়া অফিস,পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকা,দশমিনার বীজ বর্ধন খামার,পায়রা কুঞ্জ,লেবুখালী কৃষি উদ্যানতত্ত্ব গবেষনা কেন্দ্র ইত্যাদি।

∞যোগাযোগ ব্যবস্থা :-

পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা,পাষানময়ী কালি মন্দির,ডাকাতিয়া কালিবাড়ি, পায়রা কুঞ্জ,লেবুখালী উদ্যান তত্ত্ব গবেষনা কেন্দ্র ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিদ্যালয়ে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে চলে আসা যায় কোন ঝামেলা ছাড়া। বিশেষ করে ঢাকা থেকে বর্তমানে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে প্রায় অর্ধশতাধীক এসি/ননএসি বাস ছাড়ে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিভাগীয় শহরগুলো থেকেও বিলাস বহুল সরাসরি বাস আসে কুয়াকাটায়। এসব বাসে সরাসরি চলে আসা যায় কুয়াকাটায়। এছাড়া ঢাকা সদরঘাট থেকে বরিশাল,পটুয়াখালী,কলাপাড়া ও আমতলীগামী ডাবল ডেকার বিলাস বহুল লঞ্চ প্রতিদিন ছেড়ে আসে। এগুলোতে এসে গাড়ি করে চলে যাওয়া যায় কুয়াকাটা। রাঙ্গাবালি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মামুন খান জানান, প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য দেখতে সোনার চর যেতে পর্যটকদের প্রচুর বিড়াম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। এখানে দাড়িয়েও একই সাথে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে পারেন পর্যটকরা। তবে এখনও মসৃন যোগাযোগ ও আবাসন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় পর্যটকরা সেখানে সহজে যেতে কিংবা অবস্থান করতে পারেন না। তিনি জানান, শীতের সময় প্রচুর পর্যটক সোনার চরে লঞ্চ,ট্রলার নিয়ে আসেন এবং সেখানে অবস্থান করেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেন্টমার্টিন খ্যাত সোনার চরে একই সাথে বিশাল ম্যানগ্রোভ বনভূমি,হরিনসহ বন্য প্রাণীর বিশাল সম্ভারের দেখা মেলে সোনার চরে। তিনি সরকারের কাছে দাবী জানান,পর্যটন শিল্প বিকাশে জরুরী ভিত্তিতে সোনার চরে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত আবাসন সুবিধা চালু করার।

∞সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ :-

কুয়াকাটা নির্ভর পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকার গত ১০ বছরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পন্ন করেছে। ইতিমধ্যে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ফেরী বিহীন ডাবল লেনের মসৃন সড়ক নির্মান,আধুনিক ও দৃষ্টি ননন্দ সেতু নির্মান,কুয়াকাটার অভ্যন্তরীন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানান পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। কুয়াকাটায় ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে তিন তারকা মানের হোটেল মোটেলসহ প্রায় দুই শতাধীক আধুনিক হোটেল মোটেল ও রেষ্ট হাউস। বীজ কেন্দ্রীক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ফাতরার বনাঞ্চরে ঘোরার ট্যুরিষ্ট বোর্ড সার্ভিস। রয়েছে ওয়াটার স্কুটার,স্প্রীড বোড সুবিধা। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের গভীরে চর বিজয়ে দিনভর ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা রয়েছে এখানে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কুয়াকাটায় স্থাপন করা হয়েছে ট্র্যুরিষ্ট পুলিশের একটি ইউনিট। তবে বর্তমানে পর্যটকদের যে সুবিধা সরকারি-বেসরকারী পর্যায়ে প্রদান করা হচ্ছে তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে মনে করেন পর্যটকরা। ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা ব্যবসায়ী আল-আমীন জানান(৪২) তিনি তারা পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে এসেছেন। কিন্তু বীচের অবস্থা দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন। সমুদ্রের ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষার কোন স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় কুয়াকাটা এখন পুরোপুরি হুমকীর মধ্যে রয়েছে বলে দাবী করেন তিনি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানিয়েছে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা প্রকল্প নামে প্রায় সাড়ে নয় শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি পাস হলে কুয়াকাটার সৌন্দর্য আরো বহুগুন বৃদ্ধি পাবে বলে দাবী সংশ্লিষ্ঠদের।

∞সংশ্লিষ্ঠদের অভিমত :-

কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন এর সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার জানান,কুয়াকাটা কেন্দ্রীক পর্যটন ব্যবসা করোনা অতিমারীর আগে যে অবস্থায় ছিলো দেড় বছরের লক ডাউনের ফলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এ শিল্পের সাথে জড়িতরা। বর্তমানে মুলধন সংকেটর কারনে অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে গেছে। সরকারী বা বেসরকারী পর্যায় থেকে কোন সহয়তা পায়নি। সরকার যে প্রনোদনা ঘোষনা করেছে এ পর্যন্ত কোন ব্যবসায়ী তার একটি টাকাও পায়নি। কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওয়ানার্স এসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক আবদুল মোতালেব শরীফ জানান,সরকারের দপ্তরের পর দপ্তর ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু করোনা অতিমারীর কোন সহয়তা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌছতে পারেন নি। তিনি জানান,হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা অনুদান চায় না। তারা স্বল্পসুদে ঋন চায়। ব্যবসা স্বাভাবিক হলে আবার ঋনের টাকা ফেরত দিবে তারা। পর্যটন নির্ভর ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের ঋন সহয়তার কোন বিকল্প নেই বলে দাবী করেন তিনি।

∞জেলা প্রশাসকের বক্তব্য :

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান,পটুয়াখালীর পর্যটন ব্যবসা থেকে কি পরিমান রাজস্ব আয় হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান জেলার কোন দপ্তরের কাছে নেই। তবে সরকার পর্যটন শিল্প বিকাশে সমন্বিত একাধীক পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। আগামী কয়েক বছরে এ প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যাবে। উপকূলীয় এলাকাকে ঘিরে সরকারের একটি গুচ্ছ পর্যটন শিল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া জেলার অভ্যন্তরীন যে সম্ভবনাময় পর্যটন স্পটগুলো রয়েছে সেগুলোর মানোন্নয়ন করে সাধারন মানুষের দৃষ্টি আর্কষন করতে পারলে আরো বেশী মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে বলে মনে করিন তিনি।